Saturday, 30 August 2014

রজনী---তার ছেঁড়া

" এক ঘন্টায় কাজ হলে ২০০
টাকাতেই হবে ! "
একটা মেয়েকন্ঠের আওয়াজ
পেয়ে চমকে তাকালাম ।
দেখি আমার পাশের
বেঞ্চে বসে একমনে নিজের
পার্স খুটখাট করছে ।
কথাটা কাকে বলল বুঝলাম না ।
আশেপাশেও কোন মানুষ
দেখছি না । এখন রাত প্রায় ১০ টার
কাছাকাছি । মেয়েটার
দিকে খেয়াল করলাম ।
ল্যাম্পপোষ্টের হালকা আলোয়
তাকে দেখতে অদ্ভুত
সুন্দরী মনে হচ্ছে ।
মনে হচ্ছে আকাশ থেকে কোন
পরী মাটিতে নেমে এসেছে
এবং তার
ডানাদুটি খুলে রেখে দিয়েছে ।
- কি দেখেন ? মেয়েটির কথায়
আমি থতমত খেয়ে গেলাম । একটু
অস্বস্তির মাঝে পড়ে গেলাম ।
মেয়েটি অন্যকিছু
ভেবে বসলে সমস্যা । এই রাত
বিরেতে , জনাকীর্ণ
পার্কে একটা মেয়ে আর
আমি একা । দূরে অবশ্য মানুষজন
দেখতে পাচ্ছি । কিন্তু
এখানে কেউ নেই । ভয় পাচ্ছি এই
ভেবে এখনকার যুগে ইভ
টিজিং এর কেইস খুব মারাত্নক ।
মেয়েটি আবার বলল , " চলবে ? "
এবার বুঝলাম আসল ঘটনা ।
সে নিশিকন্যা । আগেও
দেখেছি নিশিকন্যা , কিন্তু
এতটা সুন্দরী দেখি নাই । কেন
জানি না , আমার নিশিকন্যার
প্রস্তাবে সায় দিতে ইচ্ছে হল ।
আমি বললাম ,
- হুম ।
- ২০০ টাকা লাগবে ।
- হুম ।
- আপনে নিয়া যাবেন না আমার
জায়গায় যাবেন ?
- আমার জায়গা নাই । আপনার
জায়গাতেই চলেন ।
- আসেন আমার সাথে ।
রিক্সাভাড়া আছে ?
- থাকতে পারে । দেখে নিব ?
- দেখে নিবেন
নাতো কি করবেন ! পকেটের
টাকার খবরও জানেন না ?
*
ইদানিং একটা রোগে ভুগছি । শর্ট
টাইম মেমোরি লস ! হয়ত অধিক
টেনশন করার কারণে । পকেটে কত
টাকা আছে কিছুক্ষণ আগেও
দেখেছিলাম কিন্তু ভুলে গেছি ।
পকেট হাতরে ৩৫২ টাকা পেলাম ।
রিক্সায় ওঠার
আগে নিশিকন্যা একটা চুয়িং
গাম মুখে পুড়ল । আমি একটু অবাক
হলাম । আমি জানতাম
নিশিকন্যারা পান খেয়ে ঠোঁট
লাল করে । কিন্তু এখানে তার
ব্যাতিক্রম ।
*
জীবনে কখনও
পতিতালয়ে যাইনি । আজ কেন
জানি না যেতে ইচ্ছে হল ।
মানুষের মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব
ইচ্ছা জাগে । নিশিকন্যার ঘরদোর
খুব গোছালো । আমি খাটের উপর
বসে আছি । মেয়েটির মুখ
থেকে মায়াবী ভাবটা চলে
গেছে । হয়ত আলোর কারণে ।
মায়ার জায়গায়
নিষ্ঠুরতা চেপে বসেসে । হয়ত
সমাজের নিষ্ঠুরতা নিজের
করে নিয়েছে । মেয়েটির নাম
ধরে ডাকতে ইচ্ছা করছে ।
জিজ্ঞেস করব কিনা ভাবছি ।
না থাক ! কি দরকার !
মেয়েটি হঠাৎ বলল ,
- বসে আছেন ক্যান ?
- আপনার নাম কি ?
- ঢং কইরেন না ।
তারাতারি কাজ করে চলে যান ।
*
আমি বসেই আছি ।
বসে থাকতে ভালো লাগছে ।
নিশিকন্যাও বসে আছে । আমার খুব
পানির পিপাসা পাচ্ছে ।
নিশিকন্যাকে পানি আনতে বলব ।
কিন্তু কি বলে সম্বোধন করব
জানি না । "দেবদাস" এর সেই
নিশিকন্যার নাম
ধরে ডাকতে ইচ্ছা করছে । কিন্তু
নামটা মনে পড়ছে না । শর্ট টাইম
মেমোরি লসের প্রভাব ।
*
এক ঘন্টা হয়ে গেছে । আমি বসেই
আছি । পানির পিপাসা তীব্র
থেকে তীব্রতর হয়েছে ।
পিপাসা নিয়ে থাকতে ভালো
লাগছে না ।
আমি নিশিকন্যাকে পানি দিতে
বল্লাম । কিন্তু ও বলল , " আপনার
টাইম শেষ ।
বাইরে গিয়ে পানি খান । "
আমি কিছু না বলে টাকা দিলাম
। ও নির্লিপ্ত
ভাবে টাকাটা নিয়ে নিল যেন
এটাই সাভাবিক ।
*
" আজকেও বসে আছেন এখানে ? "
গলাটা শুনেই চিনতে পারলাম
এটা সেই নিশিকন্যার ।
আমি সরাসরি বললাম , আজকে ২০০
টাকা নাই । ৫০ টাকা কম
আছে মনে হয় । ও একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেলে বলল , চলেন ।
দীর্ঘশ্বাসটা তার ৫০ টাকা লসের
নাকি আমার
অযথা টাকা অপচয়ের
সেটা বুঝলাম না ।
*
আজকেও নিশিকন্যার নাম
জানা হয় নাই । নিশিকন্যা অনেক
কঠিন মেয়ে ।
*
আজ অষ্টম দিন । এই কয়দিন নিয়মিত
নিশিকন্যার বাসায় গিয়েছি ।
ধীরে ধীরে তার সব
কথা শুনেছি ।
শুনে মনটা তিক্ততায় ভরে গেছে ।
সমাজের এহেন কর্মের
কাছে নিশিকন্যার কর্মটাও আমার
কাছে ভালো মনে হল ।
নিশিকন্যার নাম
জানতে পেরেছি । কিন্তু এখন
মনে পড়ছে না । আজ আসার সময়
হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল ।
এখনও খুলে পড়া হয় নাই । পড়ব
কিনা ভাবছি । আগ্রহটা আরেকটু
বাড়ুক ।
মিস্টার , আপনি অনেক
বোকা একজন মানুষ । হয়ত সহজ সরল
অথবা উদার ।
আমি জানি না আপনি কি ।
জানার ইচ্ছাও করি না । থাক
না কিছু রহস্য আপনার মাঝে ।
আমি জানি না , আপনি কেন
আমার প্রতি এত দয়া করেছেন ।
জানি না কেন প্রতিদিন ২০০
টাকা নষ্ট করে আমার
পাশে বসে ছিলেন ।
জানিনা আপনি নাপুংশক কিনা ।
কিছু জানতেও চাইনা । মিস্টার ,
এই শরীরে শত পুরুষের আঁচড় আছে ।
কিন্তু এই হৃদয়ে কেউ আঁচড়
দিতে পারেনি । আপনি একমাত্র
পুরুষ যে আমার মনে বিশাল
একটা দাগ কেটে দিয়েছে ।
আমি চাই না আমি আপনার
জীবনে স্থান পাই । কারণ আমার
স্থান স্বর্গে নয় , নরকে । তাই
চলে যাচ্ছি , অনেক দূরে কোথাও
। নিশিকন্যারা না পায় এই
সমাজে স্থান , না পায় এই
জীবনে স্থান । উপরন্তু পরকাল
বলেও যদি কোন জীবন থাকে ,
জানি সেখানেও স্থান হবে না ।
আমি জানি না আপনি হিন্দু
নাকি মুসলিম অথবা বৌদ্ধ
খ্রীস্টান । তবে যদি আমি হিন্দু
হতাম , আপনাকে নিশ্চিত দেবতার
আসনে বসিয়ে দিতাম ।
আমি মানুষ , কুলাঙ্গার এক মানুষ ।
কুলাঙ্গার মানুষদের
ভালোবাসতে নেই । এটা তাদের
জন্য মহা অপরাধ । কিন্তু আমি এই
অপরাধটা করব । হয়ত দূর থেকে ।
অথবা আকাশের তারা হয়ে । আর
কিছু লিখে আপনাকে বিভ্রান্ত
করব না মিস্টার । হয়ত আর
দেখা হবে না । আশা করব
আমাকে ভুলে যাবেন । বিদায় !"
চিঠিটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস
বের হল । খুব ঘুম পাচ্ছে । ঘুমে চোখ
প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ।
নিশিকন্যার
নামটা মনে পড়েছে । রাতের
সাথেই তার সম্পর্ক । তার নাম যে '
রজনী ' ! 



লেখক

তার ছেঁড়া 

No comments:

Post a Comment