অনেকদিন পর রাজশাহী আসলাম । এক
ভার্সিটির বন্ধুর সাথে দেখা করতে । আমার
অনেক ভালো বন্ধু । যদিও ভার্সিটির
গন্ডি পেরোবার পর ৩ বছরে তার সাথে যোগাযোগ
বলতে শুধুই মোবাইল ফোন ছিল । আজ ঢাকায়
ব্যাক করব । ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে ।
তাই ঢাকায় যাওয়ার জন্য ট্রেন একমাত্র
অবলম্বন । কিন্তু এই ট্রেনেও টিকিট নাই ।
এমনকি ট্রেনের ভিতরেও দাড়ানোর জায়গা নাই
। তাই বাধ্য হয়ে ট্রেনের ইঞ্জিনেই উঠলাম ।
***
এখন বিকালের শেষ । শীতের মাঝেরদিক । তাই
হালকা কুয়াশা পড়া শুরু হয়েছে । ঠান্ডাও
লাগছে কিছুটা । ব্যাপার নাহ ! এরকম আগেও
অনেক জার্নি করেছি । ভার্সিটির
পরীক্ষা দেয়ার সময়ও এসেছিলাম এভাবে ।
এরপর আরেকবার এসেছিলাম নওশীনকে নিয়ে ।
নওশীন !!! নামটা আমার কাছে অনেক
মূল্যবান একটা নাম । নওশীনের কথা ভাবতেই
সাত বছর আগের সেই দিনগুলোর
কথা মনে পড়ে গেল ।
***
আমি তখন রাবির ২য় বর্ষের ছাত্র । আর নওশীন
সবেমাত্র ভর্তি হয়েছে । নওশীনের
বাসা রাজশাহীতেই । আমিও তখন ২য়
বর্ষে উঠে নিজেকে সিনিওর ভাবতে শুরু
করে দিয়েছি । সেদিন আমরা বন্ধুরা প্লান
করলাম আজ র্যাগ দিতে হবে । যা ভাবা তাই
কাজ । হল থেকে বেড় হলাম আমরা কয়েকজন ।
২য় সায়েন্স বিল্ডিংয়ের সামনে যেতেই নওশীনের
বান্ধবীদের দল পড়ে গেল । ভাবলাম
এদেরকে দিয়েই শুরু করা যাক ।
ওদেরকে ডেকে বললাম ,
- এই আপুরা শোন শোন ।
- জ্বী ভাইয়া ? ( তাদের মাঝে একজন বলল )
- তোমরা কি এবার ভর্তি হইলা ?
- জ্বী ভাইয়া ।
- ও । কোন ডিপার্টমেন্ট ?
- ফার্মেসী ।
- তোমরা সবাই ?
- না ভাইয়া । আমরা সবাই ফার্মেসী শুধু
নওশীন এপ্লাইড ফিজিক্সে ।
এপ্লাইড ফিজিক্স ছিল আমার ডিপার্টমেন্ট ।
তাই মেয়েটাকে দেখার খুব ইচ্ছা হয়েছিল ।
আমি বললাম ,
- কোথায় তোমাদের সেই নওশীন ?
পিছনের দিক থেকে মায়াবী চেহারার এক
মেয়ে সামনে এসে দাড়াল । দেখতে সুন্দরের
চেয়ে একটু বেশি কিছু ।
সে এসে বলল ,
- আমি ভাইয়া ।
- ও আচ্ছা । যাইহোক , তোমরা তো ম্যানার
বলতে কিছুই শেখ নাই ।
- কেন ভাইয়া ?
- বড় ভাইয়াদের দেখে সালাম দিতে হয়
জানো নাহ ?
- ওহ স্যরি ভাইয়া ।
নওশীনের গলার স্বর অত্যাধিক মিষ্টি । আমার
কান মনে হয় মধু গ্রহণ করছিল । আমি বললাম ,
- স্যরি বললে তো হবে না । তোমার শাস্তি হল
এখন একটা গান বলতে হবে ।
আমার
পাশে থেকে বন্ধুরা খোচা দিয়ে বুঝাতে চাইল এই
শাস্তি অনেক কম হয়ে গেল । কিন্তু আমার কেন
জানি নওশীনের গলায় গান শোনার জন্য
মনটা উথাল পাতাল করছিল । আমার
বন্ধুরা তাদের নার্ভাস করার জন্য
ইচ্ছা করে জোরে জোরে হাসতে লাগল । আর
নওশীনের বান্ধবীরা ভয়ে কোন কথাই
বলতে পারছিলনা যদি তাদেরও এই অবস্থায়
পড়তে হয় । এত দেরি হচ্ছে দেখে আমি প্রাণপণ
একটা ধমক দিয়ে বললাম ,' এই মেয়ে কি হল !
কথা কানে যায় নাই ? তোমায় গান
গাইতে বলছি । চুপ করে দাড়িয়ে থাকতে বলি নাই
।'
আমার কথা শেষ হতে না হতেই নওশীন
ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দিল । আমি খুবই অস্বস্তির
মাঝে পড়ে গেলাম । তারপর বললাম , '
আচ্ছা ঠিক আছে । গাইতে হবে নাহ । যাও এখন
। নেক্সট টাইম যেন এমন ভুল না হয় ।' বলেই
আমরা আর দাড়ালাম না । পিছনে একবার
তাকিয়ে দেখলাম নওশীন তখনও কাঁদছে আর
তার বান্ধবীরা তাকে ঘিরে আছে । হয়ত
সান্তনা দিচ্ছে আর আমার চোদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার
করছে ।
অনেকদিন নওশীনের সাথে আমার দেখা হয়না ।
হয়ত আমি নিজেই লজ্জায় তার সাথে আর
দেখা করতে চাইনি ।
তবে মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম , এরপর যেদিন
দেখা হবে , সেদিনই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিব ।
নওশীনের বান্ধবীদের মাঝে মাঝেই দেখতাম ।
তারা আমাকে দেখলেই ফিসফিস করে কি কি বলত
। আমার গুষ্ঠি উদ্ধার করত মনে হয় । এরপর
আরো সাতদিন চলে গেল । কিন্তু নওশীনের
দেখা পেলাম না । আমার কেমন জানি খারাপ
লাগতে লাগল । ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নিলাম ।
কিন্তু পেলাম না । বাধ্য
হয়ে ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টে গিয়ে লজ্জার
মাথা খেয়ে ওর বান্ধবীদের কাছে খবর নিলাম
। ওদের কাছে জানতে পারলাম , সেদিনের পর
থেকে নওশীন ক্যাম্পাসে আসে না ।
কারণটা আমি । নিজেকে অপরাধী মনে হল ।
ওদের কাছে নওশীনের ফোন নাম্বার নিলাম ।
বিকালে নওশীনকে ফোন দিয়ে আকুল
ভাবে ক্ষমা চাইলাম । নওশীন কোমলমতি মেয়ে ।
তাই ক্ষমা পেতে বেগ পেতে হয়নি । পরদিন
ওকে আমি ক্যাম্পাসে আসতে বললাম । ও
রাজি হল । আমার নিজেকে দায়মুক্ত মনে হল ।
***
এরপর থেকেই নওশীনের সাথে আমার বন্ধুত্বের
শুরু । ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হয়ে উঠল ।
একসাথে ফুসকা খাওয়া , ক্যাম্পাসের
পুকুরপাড়ে বসে সময় কাটানো , একসাথে বাদাম
খেতে খেতে ক্যাম্পাসের শেষ মাথায়
চলে যাওয়া আমাদের ডেইলি রুটিন হয়ে গিয়েছিল ।
কতদিন যে পুকুরপাড়ে বসে গল্প
করতে অথবা হাটতে হাটতে হাটতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল
তার ইয়াত্তা নেই । ওর
কাছে জানতে পেরেছিলাম ওদের
বন্ধুমহলে আমায় " র্যাগ ভাইয়া " ট্যাগ
দেয়া হয়েছে । লজ্জা পাবো নাকি গর্ব করব
বুঝতে পারি নাই । এভাবেই চলে গেল সাত আট
মাসের মত । কিন্তু এই কয়টা মাসে নওশীনের
মনের অবস্থা কি হয়েছিল জানি না , কিন্তু
আমার ভিতর ' বন্ধুত্ব ' নামের
সত্ত্বাকে ঝেটিয়ে দিয়ে ' ভালবাসা ' নামক
বস্তুটি দখল করে নিয়েছিল ।
নওশীনকে ছাড়া আমার একটা ঘন্টাও কাটত
না । মাঝ্দ মাঝে যখন নওশীনের
বান্ধবীরা আমাকে র্যাগ
ভাইয়া বলে ডাকত , তখন বলতে ইচ্ছা হত , "
হ্যাঁ বল শ্যালিকাগণ " আর যখন নওশীন
আমাকে ক্ষেপানোর জন্য বলত " র্যাগ বাবু " ,
সেই অনুভূতির কথা বলে বুঝানো যাবে না ।
মনে হত ভালোবাসার
পক্ষীরাজে চড়ে আমি মেঘের
দেশে উড়ে বেড়াচ্ছি ।
***
ফেব্রুয়ারী মাস চলে এল । সেদিন ছিল 13th
ফেব্রুয়ারী । আমি ভাবলাম এবার আমার
মনের কথা নওশীনকে বলতে হবে । এই সুযোগ
হাতছাড়া করা যাবে না । কিন্তু সবাই
তো এইদিন তাদের পছন্দের মানুষকে তাদের
ভালোবাসার কথা বলবে । তাই
আমাকে স্পেশাল কিছু করতে হবে ।
ক্যাম্পাসে আমার নেতাগোছের অনেক বড়ভাই
ছিল । তাই আমার বিপদ
নিয়ে আমি অতটা চিন্তিত ছিলাম না । ১৩
ফেব্রুয়ারী রাত ১১ টার মাঝেই চলে গেলাম
নওশীনের বাসার সামনে । ঠিক রাত ১২ টায়
নওশীনকে ফোন দিয়ে ব্যালকনিতে আসতে বললাম
। আমি হাতে একগাদা গোলাপ
নিয়ে দাড়িয়ে ছিলাম নওশীনের বাসার সামনের
রাস্তায় । নওশীনরা থাকত তিন তলায় । ও
এসে আমাকে ফুলের তোড়া হাতে ল্যাম্পপোষ্টের
নিচে দাড়িয়ে থাকতে দেখে হয়ত অবাক হয়েছিল ।
আর আমি !!! আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম
ওকে দেখে । পৃথিবী সমস্ত মুগ্ধতা এসে আমায়
ভর করেছিল । হালকা মৃদু আলোয়
খোলা চুলে দাড়িয়ে ছিল নওশীন । যেন আকাশ
থেকে কোন ডানাকাটা পরী ভুল করে পৃথিবীর
এই বাড়ীটার ব্যালকনীতে নেমে এসেছে । নতুন
করে আরেকবার এই মায়াবী মেয়েটার
প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম । যখন সংবিৎ ফিরল , তখন
আমার ভিতরে লজ্জা আর ভয়
এসে ডানা বাধল । তাই কি করব না করব
ভেবে পেলাম না । মনের ভিতর
গুছিয়ে রাখা কথাগুলন অগোছালো হয়ে গিয়েছিল ।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করে বললাম " আই
লাভ ইউ নওশীন " । বলার পর মনে হল
রাস্তার মানুষ কি ভাবে ভাবুক কিন্তু ওর
বাবা মা যদি শুনে ফেলে তবে কি হবে । তাই
দিলাম এক ভো দৌড় !
রিক্সা নিয়ে চলে আসলাম হলে ।
ফুলের তোড়াটা আমার হাতেই
রয়ে গিয়েছিল । রুমে এসে ভাবলাম
কাজটা কি ঠিক করলাম ! যদি নওশীন
এখন তার সাথে কথা বলা বন্ধ
করে দেয় !!! ধ্যাত্তেরী ! যা ছিল
তাই তো ভালো ছিল , নওশীন
তো পাশে ছিল । হোক না বন্ধু হয়ে ,
তবুও তো ছিল । কিন্তু এখন তো সেটাও
বুঝি আর হল না । আর সহ্য
করতে পারলাম না । নওশীনকে ফোন
দিব কিনা ভাবছিলাম । রাত প্রায় ১
টার মত বাজে । আবার মনে হল , এত
রাতে কল দিব ? এর আগেও তো রাত ১
টা কেন , ২ টা ৩ টার দিকেও
ওকে ফোন করে জ্বালাইতাম । কিন্তু
আজ কেমন যেন দোটানার
মাঝে আছি । আর কিছু ভাবার সময়
নাই , ওর সাথে কথা বলতে হবে । ফোন
দিলাম । কিন্তু একি ! ফোন অফ ।
টেনসনে এবার স্ট্রক করার
অবস্থা আবার । ভেবে পাচ্ছিলাম
না কি হবে এখন !
***
ট্রেইনের হুইশের শব্দে সংবিৎ ফিরল ।
সামনে স্টেশন । নেমে হাত
পা ঝারাঝারি করতে হবে । সময়
পেলে এককাপ চাও হয়ে যাবে ।
চা অর্ধেক শেষ হতে না হতেই
ট্রেইনের হুইশেল বেজে উঠল ।
তরিঘরি করে টাকা দিয়ে বাকি চাটুকু
গলায় ঢেলে দৌড় দিলাম । ট্রেইন যখন
গড়াতে শুরু করল
ততক্ষণে আমি ট্রেইনের
ইঞ্জিনে উঠে গেছি । গলা আর
জিহ্বা জ্বলছে । মনে হয় পুড়ে গেছে ।
পুড়ে যাওয়ার কথা মাথায় আসতেই
মনে পড়ল , নওশীনের চা খুব প্রিয় ছিল ।
চা ছাড়া ওর চলতই না । যত গরমই হোক
সে খুব স্মুথলি তা খেতে পারত ।
কিন্তু আমি খেতে পারতাম না । একটু
ঠান্ডা করে খেতে হত ।
এনিয়ে কতবার যে নওশীনের ঠাট্টার
পাত্র হয়েছি তা বলা বাহুল্য ।
বলতে গেলে এই র্যাগ বাবুকে গরম
চা কিভাবে খেতে হয় তা নওশীনই
শিখিয়েছে । আহ , কতই না মধুর স্মৃতি !
ধুর কি যে ভাবছি আমি । পকেট
থেকে সিগারেট বেড়
করে মুখে নিলাম । চলন্ত ট্রেইনের
ইঞ্জিনে বসে সিগারেট
জ্বালাতে অনেক কসরৎ করতে হল ।
নিকোটিনগুলো একটু একটু করে মলিন
হয়ে যাও স্মৃতিগুলোকে উজ্জ্বল
করে দিচ্ছে । যেন সব আমার চোখের
সামনে ।
***
নওশীনের ফোন বন্ধ
পেয়ে রাতটা আমার নির্ঘুমই কাটল ।
অপেক্ষা করছিলাম কখন সকাল
হবে আর কখন নওশীন
ক্যাম্পাসে আসবে । ওর
সাথে দেখা করা জরুরী । ওর উত্তর
যদি ' হ্যাঁ্ִ হয় , তবে তো কথাই নাই আর
যদি 'না' হয় তবে তো সব শেষ ।
একটা উপায় বেড় করেছিলাম । ও
যদি না বলে তবে ওকে বলব , ' জাস্ট
কিডিং ইয়ার ' । কিন্তু কথাগুলো আর
বলা হয় নাই । কারণ , নওশীন সেদিন
ক্যাম্পাসেই আসে নাই । ওর
বান্ধবীদের কাছে খোঁজ নিলাম ।
ওরা বলল , নওশীন
একটা ফ্যামিলি ট্যুরে গেছে আ
সকালে । ফিরতে ছয় সাতদিন
দেরি হবে । বুকের ভিতর
চাপা দিয়ে রাখা টেনশন এবার
মুখের ভিতর প্রকাশ পেল । এজন্যই হয়ত
ওদের মাঝে একজন বলল ,
- ভাইয়া , কিছু কি হইছে ?
- নাতো ! কই কি হবে !
- না মানে , আপনাকে দেখে খুব
চিন্তিত মনে হচ্ছে ।
- নাহ ! কোন চিন্তা না । আসলে ঘুম
হয়নি তো ।
ওরা কি বুঝল কে জানে ।
হেসে হেসে বলল ,
- ওওও বুঝেছি । আজ তো ভ্যালেন্টাইন
ডে । কাউকে বোধয় কিছু বলবেন তাই
না ? চিন্তা করবেন না ভাইয়া ।
আমরা হেল্প করতে পারি ।
বিনিময়ে কিছু দিতে হবে অবশ্যই ।
- বুঝলাম না ।
-
আমরা আপনাকে কিভাবে প্রোপোজ
করলে মেয়ের এক্সেপ্ট করে সেই
ট্রিকস শিখাই দিব । যদি ট্রিটের
পরিমাণ বেশি হয়
তবে আমরা নিজেরা গিয়ে আপনার
সুন্দর একটা ক্যারেক্টার
সার্টিফিকেটও দিয়ে আসব ।
- আরেহ নাহ ! আমার আর প্রেম ,
তেলাপোকাও একটা পাখি !
নওশীনের বান্ধবীরা হাসতে শুরু করল ।
আমিও একটু হেসে জিজ্ঞেস করলাম ,
- আচ্ছা , নওশীনের ফোন বন্ধ কেন
বলতে পার ?
- কি জানি ভাইয়া । আমাদের তো ও
ওর আম্মুর ফোন দিয়ে কল দিয়েছিল ।
এরপর আর কিছুক্ষণ ওদের
সাথে কথা বলে আমি হলে চলে আসলাম
। ক্লাশ করার মত মানষিকা আজ আর
নাই ।
***
শুরু হল দ্বিতীয় ধাপের এক একটা দীর্ঘ
বিরক্তিকর অস্বস্তিভরা মূহুর্ত । মনের
ভিতর হাজার হাজার খারাপ
ভালো চিন্তা শুরু হয়ে গিয়েছিল ।
রাত নেই দিন নেই ,
মনে কয়েকটা চিন্তা ঘুরে ফিরে আসছিল
। নওশীন ফোন অফ
করে রেখেছে কেন ? ও কি রাগ
করেছে ? আমার কথা ও
বাবা মা শুনতে পেয়েই
কি ওকে নিয়ে রাজশাহীর
বাইরে বেড়াতে গেল ? এর নতুন আর
একটা চিন্তা মাথায় এসে টেনশনের
মাত্রাটা অত্যধিক বেশি করে দিল ।
ওর প্রেমিক নেই তো !
নিজেকে গাধামানব মনে হল । এই
চিন্তাটা আগেই আশা উচিৎ ছিল ।
পরক্ষণেই মনে হল , আরেহ ,
থাকলে তো জানতে পেতাম ।
না জানলেও বুঝতে পেতাম ।
কেননা মিঙ্গেল মেয়েদের আচার
আচরণ দেখেই বোঝা যায় । কিন্তু এসব
যুক্তি আমার কাছে লেইম মনে হল ! ওর
প্রেমিক থাকতে পারে , আর যে ওর
প্রেমিক , সে হয়তবা দুনিয়ার
সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষদের
মাঝে একজন । আহারে ,
আমি কি প্রেম করার আগেই
ছ্যাকা খেয়ে গেলাম !
সাতটা দিন
এভাবে ঘুমিয়ে না ঘুমিয়ে ,
খেয়ে না খেয়ে কেটে গেল ।
২১ শে ফেব্রুয়ারী । সকাল সকাল
ফোনের কলে ঘুম ভেঙ্গে গেল । ফোন
হাতে নিয়ে খুব বড় একটা শক খেলাম ।
ফোনের স্ক্রীনে লেখা " নওশীন " ।
নওশীন ফোন করেছে ।
হৃদপিন্ডটা মনে হয় ২ টা বিট মিস
করে ফেলল ।
হালকা মৃদু শব্দে দূর
থেকে একুশে ফেব্রুয়ারীর গান
ভেসে আসছিল । বাইরের আকাশ
ফর্সা হয়েছে কিন্তু এখনও রোদ
ওঠে নাই । এত সকাল সকাল
নওশীনের ফোন করার কারণ
মাথায় আসছিল না ।
কড়া কথা বলবে কি ? নাহ !
তা হতে পারে না । সবকিছুর কিছু
সময় থাকে । কড়া কথা বলতে হয়
সন্ধ্যায় । সন্ধ্যা মন খারাপ
করে দেয়ার সময় । আর
ভোরবেলা মনকে নরম কোমল
করে দেয়ার সময় ।
এসব ভাবতেই নওশীনের ফোন
কেটে গেল দুইবার । আবার ফোন
আসল । ভয়ে ফোন রিসিভ
করতে পারছিলাম না ।
কাপাকাপা হাতে শেষ
মুহূর্তে ফোন রিসিভ করলাম । ওপাশ
থেকে নওশীনের সেই চিরায়িত
মিস্টি কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম ।
- আপনি এখনও ঘুমোচ্ছেন ?
- না ইয়ে মানে , এইতো উঠলাম ।
- আজকে কি দিন এটা জানেন ?
- জানবনা কেন ? আজ ২১
শে ফেব্রুয়ারী ।
- আরো কিন্তু একটা দিন আছে ।
আজ ব্রেকাপ ডে !
আরেকবার হার্ট ২টা বিট মিস করল
। এতক্ষণ বুঝতে পারলাম , কেন
নওশীন আজ আমায় ফোন করল । আজ
ব্রেকাপ ডে । কঠিন কঠিন
কথাগুলো আজকের দিনে বলাই
মনে হয় ন্যায় সঙ্গত হবে ।
কেননা আজকের দিনটি তৈরী ই
হয়েছে কাউকে কষ্ট দেয়ার জন্য ।
- কি হল ? কথা বলছেন না যে ?
- কি বলব ? শুনতেছি ।
- ভালো করেছেন । এক ঘন্টার
মাঝে শহীদ মিনার
চত্বরে চলে আসেন ।
আপনাকে কিছু বলার আছে ।
- কি কথা ?
- দেখা হলেই বলি ?
- আচ্ছা ঠিক আছে ।
এর বেশি মুখ থেকে আর কিছু বের
হল না ।
***
কোনমতে গায়ে কিছু
জড়িয়ে টলমল করে বেড় হলা শহীদ
মিনারের উদ্দেশ্যে । মনের
মাঝে অনেক ভয় । অনেক অভিমান ।
এতদিন পর আমার কথা নওশীনের
মনে পড়ল ! হোক নাহয় , আমি একটু
বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি । তাই
বলে এভাবে আমাকে ইগনোর
করে কষ্ট দেয়ার কোন মানেই হয়
না । আমি তো আর সব ছেলের মত
না । সরাসরি 'না' বলে দিলেই হত
। আমি ওর জীবন
থেকে চলে যেতাম !
২০ মিনিট লাগল আমার শহীদ
মিনারের পাশে পৌঁছাতে । ১
ঘন্টা ১০ মিনিটের মাথায় নওশীন
আসল । এবার আর বুকের
বামপাশে হালকা চাপ অনুভব
করলাম না । অভিমান অনুভব করলাম
সাথে চোখের নিচে জলকণার
একটু চাপ । সেই চাপ
সামলাতে কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস
ফেললাম ।
- এইটা নেন ।
নওশীন রুমাল
বাড়িয়ে দিয়েছে আমার
দিকে । আমি অভিমানে বললাম , "
নো থ্যাংকস " । ডান হাতের
উল্টা পিঠ দিয়ে চোখ
মুছে নিলাম । নওশীন বলল ,
- একটু হাটতাম । আসতে পারবেন ।
আমি কিছু
না বলে উঠে দাড়ালাম । ওর
পাশে হাটতে শুরু করলাম । মিনিট
দশেক বকবক করল নওশীন । কিন্তু
আমার কানে কিছুই ঢুকছিল না ।
হাটত্দ হাটতে যখন বদ্ধভূমির
সামনে গেলাম তখন নওশীন আমার
মুখোমুখি দাড়াল । বলল ,
- আজ তো একুশে ফেব্রুয়ারী ।
- হুম ।
- সাথে ব্রেকাপ ডে ।
- সেটা বারবার জানানো কি খুব
জরুরী ?
- অবশ্যই । কারণ আজ আপনার
সাথে আমার বন্ধুত্বের ব্রেকাপ
ঘটবে ।
- নতুন করে ঘটার কি কিছু আছে ?
- অনেক কিছু । আপনি ১৪ তারিখ
কি করেছিলেন মনে আছে ?
- ভুল হয়ে গেছে । স্যরি ।
বুঝতে পারিনি ।
- ভুলটা কি আরেকবার
করতে পারবেন ?
- মানেহ !!!
- পুরাতন জিনিস আবার নতুন করে ,
অদ্ভুত জায়গায় , অদ্ভুত দিনে ?
এবার দৌড় দিবেন না কিন্তু
বলে দিলাম ।
আমার মাথায় আকাশ
ভেঙ্গে পড়লেও এতটা অবাক হতাম
না । ওর কথার
অর্থটা বুঝে দাড়িয়ে থাকার
শক্তি হারিয়ে ফেললাম । হাটু
ভেঙ্গে বসে পড়লাম ।
চোখে লোনা পানির প্রচন্ড চাপ
আসছিল । এবার আর
আটকাতে পারলাম না । কিন্তু
আমার তো খুশী হওয়া উচিৎ ,
আমি কাঁদছি কেন !!! ভাঙ্গা গলায়
শুধু কয়েকটা লাইনই বললাম ,
- রাতদিন মনের মাঝে শুধু
একজনকেই চেয়েছিলাম এই
কয়টা মাস । আমার
অদ্বিতীয়াকে । কিন্তু
আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম ।
ভাবিনি অদ্বিতীয়াকে পাব ।
কিন্তু পেলাম । তোমায় পেলাম ।
আমার অদ্বিতীয়াকে পেলাম ।
ভালোবাসি ! ভালোবাসি !! বড্ড
বেশি ভালোবাসি !!! শুধুই
ভালোবাসি ।
এরপর আর কিছু বলতে পারলাম না ।
বাচ্চাদের মত কান্না করা শুরু
করলাম । আমার অদ্বিতীয়াও আমার
সামনে হাটু গেড়ে বসল । দুই
হাতে আমার চিবুকের
নিচে ধরে মুখ তুলে ধরল ।
আলতো করে চোখের
পানি মুছে দিল ।
মিস্টি করে বলল ,
- অপচয় আমি পছন্দ করি না । তার
উপর সেটা যদি আমার র্যাগ বাবুর
মুক্তোদানা হয় ,
তবে তো আরো না !
দেখলাম , নওশীনের চোখের
কাজল
অশ্রুজলে মাখামাখি হয়ে গেছে ।
এই মায়াবী চোখের তুলনা হয়না ।
ব্ল্যাক রোজের সৌন্দর্যও যেন
হার মেনে যায় । নিজেকে ওই
দুটি চোখের একচ্ছত্র মালিক
ভেবে দুনিয়ার
সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হল । ওই
চোখের চাহনীই নওশীনের
হয়ে মিস্টি করে বলে দিচ্ছে , "
ভালোবাসি তোমায় ! "
আমি অস্ফুট স্বরে বললাম ,
ভালোবাসি ঠু !
....................লেখক
তার ছেঁড়া
ভার্সিটির বন্ধুর সাথে দেখা করতে । আমার
অনেক ভালো বন্ধু । যদিও ভার্সিটির
গন্ডি পেরোবার পর ৩ বছরে তার সাথে যোগাযোগ
বলতে শুধুই মোবাইল ফোন ছিল । আজ ঢাকায়
ব্যাক করব । ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে ।
তাই ঢাকায় যাওয়ার জন্য ট্রেন একমাত্র
অবলম্বন । কিন্তু এই ট্রেনেও টিকিট নাই ।
এমনকি ট্রেনের ভিতরেও দাড়ানোর জায়গা নাই
। তাই বাধ্য হয়ে ট্রেনের ইঞ্জিনেই উঠলাম ।
***
এখন বিকালের শেষ । শীতের মাঝেরদিক । তাই
হালকা কুয়াশা পড়া শুরু হয়েছে । ঠান্ডাও
লাগছে কিছুটা । ব্যাপার নাহ ! এরকম আগেও
অনেক জার্নি করেছি । ভার্সিটির
পরীক্ষা দেয়ার সময়ও এসেছিলাম এভাবে ।
এরপর আরেকবার এসেছিলাম নওশীনকে নিয়ে ।
নওশীন !!! নামটা আমার কাছে অনেক
মূল্যবান একটা নাম । নওশীনের কথা ভাবতেই
সাত বছর আগের সেই দিনগুলোর
কথা মনে পড়ে গেল ।
***
আমি তখন রাবির ২য় বর্ষের ছাত্র । আর নওশীন
সবেমাত্র ভর্তি হয়েছে । নওশীনের
বাসা রাজশাহীতেই । আমিও তখন ২য়
বর্ষে উঠে নিজেকে সিনিওর ভাবতে শুরু
করে দিয়েছি । সেদিন আমরা বন্ধুরা প্লান
করলাম আজ র্যাগ দিতে হবে । যা ভাবা তাই
কাজ । হল থেকে বেড় হলাম আমরা কয়েকজন ।
২য় সায়েন্স বিল্ডিংয়ের সামনে যেতেই নওশীনের
বান্ধবীদের দল পড়ে গেল । ভাবলাম
এদেরকে দিয়েই শুরু করা যাক ।
ওদেরকে ডেকে বললাম ,
- এই আপুরা শোন শোন ।
- জ্বী ভাইয়া ? ( তাদের মাঝে একজন বলল )
- তোমরা কি এবার ভর্তি হইলা ?
- জ্বী ভাইয়া ।
- ও । কোন ডিপার্টমেন্ট ?
- ফার্মেসী ।
- তোমরা সবাই ?
- না ভাইয়া । আমরা সবাই ফার্মেসী শুধু
নওশীন এপ্লাইড ফিজিক্সে ।
এপ্লাইড ফিজিক্স ছিল আমার ডিপার্টমেন্ট ।
তাই মেয়েটাকে দেখার খুব ইচ্ছা হয়েছিল ।
আমি বললাম ,
- কোথায় তোমাদের সেই নওশীন ?
পিছনের দিক থেকে মায়াবী চেহারার এক
মেয়ে সামনে এসে দাড়াল । দেখতে সুন্দরের
চেয়ে একটু বেশি কিছু ।
সে এসে বলল ,
- আমি ভাইয়া ।
- ও আচ্ছা । যাইহোক , তোমরা তো ম্যানার
বলতে কিছুই শেখ নাই ।
- কেন ভাইয়া ?
- বড় ভাইয়াদের দেখে সালাম দিতে হয়
জানো নাহ ?
- ওহ স্যরি ভাইয়া ।
নওশীনের গলার স্বর অত্যাধিক মিষ্টি । আমার
কান মনে হয় মধু গ্রহণ করছিল । আমি বললাম ,
- স্যরি বললে তো হবে না । তোমার শাস্তি হল
এখন একটা গান বলতে হবে ।
আমার
পাশে থেকে বন্ধুরা খোচা দিয়ে বুঝাতে চাইল এই
শাস্তি অনেক কম হয়ে গেল । কিন্তু আমার কেন
জানি নওশীনের গলায় গান শোনার জন্য
মনটা উথাল পাতাল করছিল । আমার
বন্ধুরা তাদের নার্ভাস করার জন্য
ইচ্ছা করে জোরে জোরে হাসতে লাগল । আর
নওশীনের বান্ধবীরা ভয়ে কোন কথাই
বলতে পারছিলনা যদি তাদেরও এই অবস্থায়
পড়তে হয় । এত দেরি হচ্ছে দেখে আমি প্রাণপণ
একটা ধমক দিয়ে বললাম ,' এই মেয়ে কি হল !
কথা কানে যায় নাই ? তোমায় গান
গাইতে বলছি । চুপ করে দাড়িয়ে থাকতে বলি নাই
।'
আমার কথা শেষ হতে না হতেই নওশীন
ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দিল । আমি খুবই অস্বস্তির
মাঝে পড়ে গেলাম । তারপর বললাম , '
আচ্ছা ঠিক আছে । গাইতে হবে নাহ । যাও এখন
। নেক্সট টাইম যেন এমন ভুল না হয় ।' বলেই
আমরা আর দাড়ালাম না । পিছনে একবার
তাকিয়ে দেখলাম নওশীন তখনও কাঁদছে আর
তার বান্ধবীরা তাকে ঘিরে আছে । হয়ত
সান্তনা দিচ্ছে আর আমার চোদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার
করছে ।
অনেকদিন নওশীনের সাথে আমার দেখা হয়না ।
হয়ত আমি নিজেই লজ্জায় তার সাথে আর
দেখা করতে চাইনি ।
তবে মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম , এরপর যেদিন
দেখা হবে , সেদিনই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিব ।
নওশীনের বান্ধবীদের মাঝে মাঝেই দেখতাম ।
তারা আমাকে দেখলেই ফিসফিস করে কি কি বলত
। আমার গুষ্ঠি উদ্ধার করত মনে হয় । এরপর
আরো সাতদিন চলে গেল । কিন্তু নওশীনের
দেখা পেলাম না । আমার কেমন জানি খারাপ
লাগতে লাগল । ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নিলাম ।
কিন্তু পেলাম না । বাধ্য
হয়ে ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টে গিয়ে লজ্জার
মাথা খেয়ে ওর বান্ধবীদের কাছে খবর নিলাম
। ওদের কাছে জানতে পারলাম , সেদিনের পর
থেকে নওশীন ক্যাম্পাসে আসে না ।
কারণটা আমি । নিজেকে অপরাধী মনে হল ।
ওদের কাছে নওশীনের ফোন নাম্বার নিলাম ।
বিকালে নওশীনকে ফোন দিয়ে আকুল
ভাবে ক্ষমা চাইলাম । নওশীন কোমলমতি মেয়ে ।
তাই ক্ষমা পেতে বেগ পেতে হয়নি । পরদিন
ওকে আমি ক্যাম্পাসে আসতে বললাম । ও
রাজি হল । আমার নিজেকে দায়মুক্ত মনে হল ।
***
এরপর থেকেই নওশীনের সাথে আমার বন্ধুত্বের
শুরু । ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হয়ে উঠল ।
একসাথে ফুসকা খাওয়া , ক্যাম্পাসের
পুকুরপাড়ে বসে সময় কাটানো , একসাথে বাদাম
খেতে খেতে ক্যাম্পাসের শেষ মাথায়
চলে যাওয়া আমাদের ডেইলি রুটিন হয়ে গিয়েছিল ।
কতদিন যে পুকুরপাড়ে বসে গল্প
করতে অথবা হাটতে হাটতে হাটতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল
তার ইয়াত্তা নেই । ওর
কাছে জানতে পেরেছিলাম ওদের
বন্ধুমহলে আমায় " র্যাগ ভাইয়া " ট্যাগ
দেয়া হয়েছে । লজ্জা পাবো নাকি গর্ব করব
বুঝতে পারি নাই । এভাবেই চলে গেল সাত আট
মাসের মত । কিন্তু এই কয়টা মাসে নওশীনের
মনের অবস্থা কি হয়েছিল জানি না , কিন্তু
আমার ভিতর ' বন্ধুত্ব ' নামের
সত্ত্বাকে ঝেটিয়ে দিয়ে ' ভালবাসা ' নামক
বস্তুটি দখল করে নিয়েছিল ।
নওশীনকে ছাড়া আমার একটা ঘন্টাও কাটত
না । মাঝ্দ মাঝে যখন নওশীনের
বান্ধবীরা আমাকে র্যাগ
ভাইয়া বলে ডাকত , তখন বলতে ইচ্ছা হত , "
হ্যাঁ বল শ্যালিকাগণ " আর যখন নওশীন
আমাকে ক্ষেপানোর জন্য বলত " র্যাগ বাবু " ,
সেই অনুভূতির কথা বলে বুঝানো যাবে না ।
মনে হত ভালোবাসার
পক্ষীরাজে চড়ে আমি মেঘের
দেশে উড়ে বেড়াচ্ছি ।
***
ফেব্রুয়ারী মাস চলে এল । সেদিন ছিল 13th
ফেব্রুয়ারী । আমি ভাবলাম এবার আমার
মনের কথা নওশীনকে বলতে হবে । এই সুযোগ
হাতছাড়া করা যাবে না । কিন্তু সবাই
তো এইদিন তাদের পছন্দের মানুষকে তাদের
ভালোবাসার কথা বলবে । তাই
আমাকে স্পেশাল কিছু করতে হবে ।
ক্যাম্পাসে আমার নেতাগোছের অনেক বড়ভাই
ছিল । তাই আমার বিপদ
নিয়ে আমি অতটা চিন্তিত ছিলাম না । ১৩
ফেব্রুয়ারী রাত ১১ টার মাঝেই চলে গেলাম
নওশীনের বাসার সামনে । ঠিক রাত ১২ টায়
নওশীনকে ফোন দিয়ে ব্যালকনিতে আসতে বললাম
। আমি হাতে একগাদা গোলাপ
নিয়ে দাড়িয়ে ছিলাম নওশীনের বাসার সামনের
রাস্তায় । নওশীনরা থাকত তিন তলায় । ও
এসে আমাকে ফুলের তোড়া হাতে ল্যাম্পপোষ্টের
নিচে দাড়িয়ে থাকতে দেখে হয়ত অবাক হয়েছিল ।
আর আমি !!! আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম
ওকে দেখে । পৃথিবী সমস্ত মুগ্ধতা এসে আমায়
ভর করেছিল । হালকা মৃদু আলোয়
খোলা চুলে দাড়িয়ে ছিল নওশীন । যেন আকাশ
থেকে কোন ডানাকাটা পরী ভুল করে পৃথিবীর
এই বাড়ীটার ব্যালকনীতে নেমে এসেছে । নতুন
করে আরেকবার এই মায়াবী মেয়েটার
প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম । যখন সংবিৎ ফিরল , তখন
আমার ভিতরে লজ্জা আর ভয়
এসে ডানা বাধল । তাই কি করব না করব
ভেবে পেলাম না । মনের ভিতর
গুছিয়ে রাখা কথাগুলন অগোছালো হয়ে গিয়েছিল ।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করে বললাম " আই
লাভ ইউ নওশীন " । বলার পর মনে হল
রাস্তার মানুষ কি ভাবে ভাবুক কিন্তু ওর
বাবা মা যদি শুনে ফেলে তবে কি হবে । তাই
দিলাম এক ভো দৌড় !
রিক্সা নিয়ে চলে আসলাম হলে ।
ফুলের তোড়াটা আমার হাতেই
রয়ে গিয়েছিল । রুমে এসে ভাবলাম
কাজটা কি ঠিক করলাম ! যদি নওশীন
এখন তার সাথে কথা বলা বন্ধ
করে দেয় !!! ধ্যাত্তেরী ! যা ছিল
তাই তো ভালো ছিল , নওশীন
তো পাশে ছিল । হোক না বন্ধু হয়ে ,
তবুও তো ছিল । কিন্তু এখন তো সেটাও
বুঝি আর হল না । আর সহ্য
করতে পারলাম না । নওশীনকে ফোন
দিব কিনা ভাবছিলাম । রাত প্রায় ১
টার মত বাজে । আবার মনে হল , এত
রাতে কল দিব ? এর আগেও তো রাত ১
টা কেন , ২ টা ৩ টার দিকেও
ওকে ফোন করে জ্বালাইতাম । কিন্তু
আজ কেমন যেন দোটানার
মাঝে আছি । আর কিছু ভাবার সময়
নাই , ওর সাথে কথা বলতে হবে । ফোন
দিলাম । কিন্তু একি ! ফোন অফ ।
টেনসনে এবার স্ট্রক করার
অবস্থা আবার । ভেবে পাচ্ছিলাম
না কি হবে এখন !
***
ট্রেইনের হুইশের শব্দে সংবিৎ ফিরল ।
সামনে স্টেশন । নেমে হাত
পা ঝারাঝারি করতে হবে । সময়
পেলে এককাপ চাও হয়ে যাবে ।
চা অর্ধেক শেষ হতে না হতেই
ট্রেইনের হুইশেল বেজে উঠল ।
তরিঘরি করে টাকা দিয়ে বাকি চাটুকু
গলায় ঢেলে দৌড় দিলাম । ট্রেইন যখন
গড়াতে শুরু করল
ততক্ষণে আমি ট্রেইনের
ইঞ্জিনে উঠে গেছি । গলা আর
জিহ্বা জ্বলছে । মনে হয় পুড়ে গেছে ।
পুড়ে যাওয়ার কথা মাথায় আসতেই
মনে পড়ল , নওশীনের চা খুব প্রিয় ছিল ।
চা ছাড়া ওর চলতই না । যত গরমই হোক
সে খুব স্মুথলি তা খেতে পারত ।
কিন্তু আমি খেতে পারতাম না । একটু
ঠান্ডা করে খেতে হত ।
এনিয়ে কতবার যে নওশীনের ঠাট্টার
পাত্র হয়েছি তা বলা বাহুল্য ।
বলতে গেলে এই র্যাগ বাবুকে গরম
চা কিভাবে খেতে হয় তা নওশীনই
শিখিয়েছে । আহ , কতই না মধুর স্মৃতি !
ধুর কি যে ভাবছি আমি । পকেট
থেকে সিগারেট বেড়
করে মুখে নিলাম । চলন্ত ট্রেইনের
ইঞ্জিনে বসে সিগারেট
জ্বালাতে অনেক কসরৎ করতে হল ।
নিকোটিনগুলো একটু একটু করে মলিন
হয়ে যাও স্মৃতিগুলোকে উজ্জ্বল
করে দিচ্ছে । যেন সব আমার চোখের
সামনে ।
***
নওশীনের ফোন বন্ধ
পেয়ে রাতটা আমার নির্ঘুমই কাটল ।
অপেক্ষা করছিলাম কখন সকাল
হবে আর কখন নওশীন
ক্যাম্পাসে আসবে । ওর
সাথে দেখা করা জরুরী । ওর উত্তর
যদি ' হ্যাঁ্ִ হয় , তবে তো কথাই নাই আর
যদি 'না' হয় তবে তো সব শেষ ।
একটা উপায় বেড় করেছিলাম । ও
যদি না বলে তবে ওকে বলব , ' জাস্ট
কিডিং ইয়ার ' । কিন্তু কথাগুলো আর
বলা হয় নাই । কারণ , নওশীন সেদিন
ক্যাম্পাসেই আসে নাই । ওর
বান্ধবীদের কাছে খোঁজ নিলাম ।
ওরা বলল , নওশীন
একটা ফ্যামিলি ট্যুরে গেছে আ
সকালে । ফিরতে ছয় সাতদিন
দেরি হবে । বুকের ভিতর
চাপা দিয়ে রাখা টেনশন এবার
মুখের ভিতর প্রকাশ পেল । এজন্যই হয়ত
ওদের মাঝে একজন বলল ,
- ভাইয়া , কিছু কি হইছে ?
- নাতো ! কই কি হবে !
- না মানে , আপনাকে দেখে খুব
চিন্তিত মনে হচ্ছে ।
- নাহ ! কোন চিন্তা না । আসলে ঘুম
হয়নি তো ।
ওরা কি বুঝল কে জানে ।
হেসে হেসে বলল ,
- ওওও বুঝেছি । আজ তো ভ্যালেন্টাইন
ডে । কাউকে বোধয় কিছু বলবেন তাই
না ? চিন্তা করবেন না ভাইয়া ।
আমরা হেল্প করতে পারি ।
বিনিময়ে কিছু দিতে হবে অবশ্যই ।
- বুঝলাম না ।
-
আমরা আপনাকে কিভাবে প্রোপোজ
করলে মেয়ের এক্সেপ্ট করে সেই
ট্রিকস শিখাই দিব । যদি ট্রিটের
পরিমাণ বেশি হয়
তবে আমরা নিজেরা গিয়ে আপনার
সুন্দর একটা ক্যারেক্টার
সার্টিফিকেটও দিয়ে আসব ।
- আরেহ নাহ ! আমার আর প্রেম ,
তেলাপোকাও একটা পাখি !
নওশীনের বান্ধবীরা হাসতে শুরু করল ।
আমিও একটু হেসে জিজ্ঞেস করলাম ,
- আচ্ছা , নওশীনের ফোন বন্ধ কেন
বলতে পার ?
- কি জানি ভাইয়া । আমাদের তো ও
ওর আম্মুর ফোন দিয়ে কল দিয়েছিল ।
এরপর আর কিছুক্ষণ ওদের
সাথে কথা বলে আমি হলে চলে আসলাম
। ক্লাশ করার মত মানষিকা আজ আর
নাই ।
***
শুরু হল দ্বিতীয় ধাপের এক একটা দীর্ঘ
বিরক্তিকর অস্বস্তিভরা মূহুর্ত । মনের
ভিতর হাজার হাজার খারাপ
ভালো চিন্তা শুরু হয়ে গিয়েছিল ।
রাত নেই দিন নেই ,
মনে কয়েকটা চিন্তা ঘুরে ফিরে আসছিল
। নওশীন ফোন অফ
করে রেখেছে কেন ? ও কি রাগ
করেছে ? আমার কথা ও
বাবা মা শুনতে পেয়েই
কি ওকে নিয়ে রাজশাহীর
বাইরে বেড়াতে গেল ? এর নতুন আর
একটা চিন্তা মাথায় এসে টেনশনের
মাত্রাটা অত্যধিক বেশি করে দিল ।
ওর প্রেমিক নেই তো !
নিজেকে গাধামানব মনে হল । এই
চিন্তাটা আগেই আশা উচিৎ ছিল ।
পরক্ষণেই মনে হল , আরেহ ,
থাকলে তো জানতে পেতাম ।
না জানলেও বুঝতে পেতাম ।
কেননা মিঙ্গেল মেয়েদের আচার
আচরণ দেখেই বোঝা যায় । কিন্তু এসব
যুক্তি আমার কাছে লেইম মনে হল ! ওর
প্রেমিক থাকতে পারে , আর যে ওর
প্রেমিক , সে হয়তবা দুনিয়ার
সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষদের
মাঝে একজন । আহারে ,
আমি কি প্রেম করার আগেই
ছ্যাকা খেয়ে গেলাম !
সাতটা দিন
এভাবে ঘুমিয়ে না ঘুমিয়ে ,
খেয়ে না খেয়ে কেটে গেল ।
২১ শে ফেব্রুয়ারী । সকাল সকাল
ফোনের কলে ঘুম ভেঙ্গে গেল । ফোন
হাতে নিয়ে খুব বড় একটা শক খেলাম ।
ফোনের স্ক্রীনে লেখা " নওশীন " ।
নওশীন ফোন করেছে ।
হৃদপিন্ডটা মনে হয় ২ টা বিট মিস
করে ফেলল ।
হালকা মৃদু শব্দে দূর
থেকে একুশে ফেব্রুয়ারীর গান
ভেসে আসছিল । বাইরের আকাশ
ফর্সা হয়েছে কিন্তু এখনও রোদ
ওঠে নাই । এত সকাল সকাল
নওশীনের ফোন করার কারণ
মাথায় আসছিল না ।
কড়া কথা বলবে কি ? নাহ !
তা হতে পারে না । সবকিছুর কিছু
সময় থাকে । কড়া কথা বলতে হয়
সন্ধ্যায় । সন্ধ্যা মন খারাপ
করে দেয়ার সময় । আর
ভোরবেলা মনকে নরম কোমল
করে দেয়ার সময় ।
এসব ভাবতেই নওশীনের ফোন
কেটে গেল দুইবার । আবার ফোন
আসল । ভয়ে ফোন রিসিভ
করতে পারছিলাম না ।
কাপাকাপা হাতে শেষ
মুহূর্তে ফোন রিসিভ করলাম । ওপাশ
থেকে নওশীনের সেই চিরায়িত
মিস্টি কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম ।
- আপনি এখনও ঘুমোচ্ছেন ?
- না ইয়ে মানে , এইতো উঠলাম ।
- আজকে কি দিন এটা জানেন ?
- জানবনা কেন ? আজ ২১
শে ফেব্রুয়ারী ।
- আরো কিন্তু একটা দিন আছে ।
আজ ব্রেকাপ ডে !
আরেকবার হার্ট ২টা বিট মিস করল
। এতক্ষণ বুঝতে পারলাম , কেন
নওশীন আজ আমায় ফোন করল । আজ
ব্রেকাপ ডে । কঠিন কঠিন
কথাগুলো আজকের দিনে বলাই
মনে হয় ন্যায় সঙ্গত হবে ।
কেননা আজকের দিনটি তৈরী ই
হয়েছে কাউকে কষ্ট দেয়ার জন্য ।
- কি হল ? কথা বলছেন না যে ?
- কি বলব ? শুনতেছি ।
- ভালো করেছেন । এক ঘন্টার
মাঝে শহীদ মিনার
চত্বরে চলে আসেন ।
আপনাকে কিছু বলার আছে ।
- কি কথা ?
- দেখা হলেই বলি ?
- আচ্ছা ঠিক আছে ।
এর বেশি মুখ থেকে আর কিছু বের
হল না ।
***
কোনমতে গায়ে কিছু
জড়িয়ে টলমল করে বেড় হলা শহীদ
মিনারের উদ্দেশ্যে । মনের
মাঝে অনেক ভয় । অনেক অভিমান ।
এতদিন পর আমার কথা নওশীনের
মনে পড়ল ! হোক নাহয় , আমি একটু
বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি । তাই
বলে এভাবে আমাকে ইগনোর
করে কষ্ট দেয়ার কোন মানেই হয়
না । আমি তো আর সব ছেলের মত
না । সরাসরি 'না' বলে দিলেই হত
। আমি ওর জীবন
থেকে চলে যেতাম !
২০ মিনিট লাগল আমার শহীদ
মিনারের পাশে পৌঁছাতে । ১
ঘন্টা ১০ মিনিটের মাথায় নওশীন
আসল । এবার আর বুকের
বামপাশে হালকা চাপ অনুভব
করলাম না । অভিমান অনুভব করলাম
সাথে চোখের নিচে জলকণার
একটু চাপ । সেই চাপ
সামলাতে কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস
ফেললাম ।
- এইটা নেন ।
নওশীন রুমাল
বাড়িয়ে দিয়েছে আমার
দিকে । আমি অভিমানে বললাম , "
নো থ্যাংকস " । ডান হাতের
উল্টা পিঠ দিয়ে চোখ
মুছে নিলাম । নওশীন বলল ,
- একটু হাটতাম । আসতে পারবেন ।
আমি কিছু
না বলে উঠে দাড়ালাম । ওর
পাশে হাটতে শুরু করলাম । মিনিট
দশেক বকবক করল নওশীন । কিন্তু
আমার কানে কিছুই ঢুকছিল না ।
হাটত্দ হাটতে যখন বদ্ধভূমির
সামনে গেলাম তখন নওশীন আমার
মুখোমুখি দাড়াল । বলল ,
- আজ তো একুশে ফেব্রুয়ারী ।
- হুম ।
- সাথে ব্রেকাপ ডে ।
- সেটা বারবার জানানো কি খুব
জরুরী ?
- অবশ্যই । কারণ আজ আপনার
সাথে আমার বন্ধুত্বের ব্রেকাপ
ঘটবে ।
- নতুন করে ঘটার কি কিছু আছে ?
- অনেক কিছু । আপনি ১৪ তারিখ
কি করেছিলেন মনে আছে ?
- ভুল হয়ে গেছে । স্যরি ।
বুঝতে পারিনি ।
- ভুলটা কি আরেকবার
করতে পারবেন ?
- মানেহ !!!
- পুরাতন জিনিস আবার নতুন করে ,
অদ্ভুত জায়গায় , অদ্ভুত দিনে ?
এবার দৌড় দিবেন না কিন্তু
বলে দিলাম ।
আমার মাথায় আকাশ
ভেঙ্গে পড়লেও এতটা অবাক হতাম
না । ওর কথার
অর্থটা বুঝে দাড়িয়ে থাকার
শক্তি হারিয়ে ফেললাম । হাটু
ভেঙ্গে বসে পড়লাম ।
চোখে লোনা পানির প্রচন্ড চাপ
আসছিল । এবার আর
আটকাতে পারলাম না । কিন্তু
আমার তো খুশী হওয়া উচিৎ ,
আমি কাঁদছি কেন !!! ভাঙ্গা গলায়
শুধু কয়েকটা লাইনই বললাম ,
- রাতদিন মনের মাঝে শুধু
একজনকেই চেয়েছিলাম এই
কয়টা মাস । আমার
অদ্বিতীয়াকে । কিন্তু
আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম ।
ভাবিনি অদ্বিতীয়াকে পাব ।
কিন্তু পেলাম । তোমায় পেলাম ।
আমার অদ্বিতীয়াকে পেলাম ।
ভালোবাসি ! ভালোবাসি !! বড্ড
বেশি ভালোবাসি !!! শুধুই
ভালোবাসি ।
এরপর আর কিছু বলতে পারলাম না ।
বাচ্চাদের মত কান্না করা শুরু
করলাম । আমার অদ্বিতীয়াও আমার
সামনে হাটু গেড়ে বসল । দুই
হাতে আমার চিবুকের
নিচে ধরে মুখ তুলে ধরল ।
আলতো করে চোখের
পানি মুছে দিল ।
মিস্টি করে বলল ,
- অপচয় আমি পছন্দ করি না । তার
উপর সেটা যদি আমার র্যাগ বাবুর
মুক্তোদানা হয় ,
তবে তো আরো না !
দেখলাম , নওশীনের চোখের
কাজল
অশ্রুজলে মাখামাখি হয়ে গেছে ।
এই মায়াবী চোখের তুলনা হয়না ।
ব্ল্যাক রোজের সৌন্দর্যও যেন
হার মেনে যায় । নিজেকে ওই
দুটি চোখের একচ্ছত্র মালিক
ভেবে দুনিয়ার
সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হল । ওই
চোখের চাহনীই নওশীনের
হয়ে মিস্টি করে বলে দিচ্ছে , "
ভালোবাসি তোমায় ! "
আমি অস্ফুট স্বরে বললাম ,
ভালোবাসি ঠু !
....................লেখক
তার ছেঁড়া

